LoginSign Up

বাংলাদেশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯

পাঁচমিশালি 2 weeks ago 4 Feb, 2020 at 12:48 pm 43
Linkedin Pint

সমগ্র বাংলাদেশের জন্য একটি অভিন্ন ও সহজে স্মরণযোগ্য জরুরী নম্বরের প্রয়োজন ছিল, যার মাধ্যমে মানুষ তার জরুরী মুহূর্তে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা এ্যাম্বুলেন্স এর সেবা পেতে পারে। একই সাথে নম্বরটি টোল ফ্রি হওয়াও প্রয়োজন। কারণ বিপদের মুহূর্তে মোবাইলের ব্যালেন্স না থাকলেও যাতে মানুষ সাহায্য চাইতে পারেন।
বাংলাদেশের ৯৯৯ ও তাই।
জরুরী ও অজরুরী ঘটনা
‌এক ভদ্রলোক ৯৯৯ এ ফোন দিয়েছেন। তিনি কোর্টে বিচারাধীন একটি মামলার বিষয়ে পরামর্শ চান। যেহেতু এখান থেকে পুলিশের সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে তিনি শুনেছেন, তাই ৯৯৯ এ ফোন দেওয়া। বস্তুত ৯৯৯ থেকে এই ধরনের কোন পরামর্শ প্রদান করা হয় না। পাইলট কর্মসূচির সময়, এক উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তাও একবার ফোন দিয়ে পুলিশের সাহায্য নিয়েছিলেন। তিনি বিমান বন্দরে যাবেন, কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। ফলে তিনি ৯৯৯ ব্যবহার করে রাস্তা পার হলেন। এটাও আসলে ৯৯৯ এর মিস ইউজ।
জরুরী সেবার ক্ষেত্রে জরুরী মুহূর্ত আসলে সেই ধরনের ঘটনা, যেখানে মানুষের জীবন সংশয় বা সম্পদ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি আছে। ঠিক এই মুহূর্তে ঘটছে বা ঘটতে পারে এমন কোন ঘটনা, যেখানে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা এ্যাম্বুলেন্স এর মতো কর্তৃপক্ষের কেউ উপস্থিত হলে এই সমস্যার সমাধান হবে, মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা পাবে- শুধু এমন ঘটনার ক্ষেত্রেই ৯৯৯ এ ফোন করা চলে। যেমন কোথাও দুর্ঘটনা ঘটেছে, কোথাও ডাকাতি বা মারামারি হচ্ছে অথবা কোথাও অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বা এই মুহূর্তে ব্যবস্থা না নিলে ঘটবে- এমন ঘটনা।
জরুরী পুলিশ সেবা
৯৯৯ এ সবচেয়ে বেশি কল আসে পুলিশের সাহায্য চেয়ে। গত এক বছরে ৯৯৯ এ সার্ভিস সম্পর্কিত কলগুলোর মধ্যে ৬৮.৪ % কল ছিল পুলিশের সাহায্য চেয়ে।
উত্তরার একটি অঞ্চল থেকে রাত আড়াইটার দিকে এক নারী ফোন করেছিলেন। তাঁর স্বামী মাতাল হয়ে তাঁকে প্রচণ্ড মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। শীতের রাত্রি। ভদ্রমহিলা তাঁর চার বছরের শিশু নিয়ে রাস্তায়। কি করবেন বুঝতে পারছেন না। কারণ ঘরের দরজায় স্বামী ভদ্রলোকটি একটা ধারালো দা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কাছে গেলেই একটা খুনোখুনি হবে।
৯৯৯ থেকে ফোন পাওয়ার পর, নিকটস্থ থানার ওসি ঐ রাত্রেই তাঁর জন্য মহিলা কনস্টেবলের ব্যবস্থা করলেন। তাঁকে রেসকিউ করে থানা থেকেই তাঁর ভাইয়ের কাছে হেফাজতের সাথে হস্তান্তর করা হল।
নিউমার্কেট এলাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ফোন করেছেন। দোকানদারের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়েছে। দোকানদার সে ছাত্রীর গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে। তিনি ৯৯৯ এ ফোন করার পর নীলক্ষেত থানা থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে আনা হয়।
এমন সব জরুরী মুহূর্তেই আমরা ৯৯৯ এ পুলিশের সাহায্য চাইতে পারি।
জরুরী ফায়ার সার্ভিসের সেবা
যে কোন ধরনের জরুরী পরিস্থিতিতেই ফায়ার সার্ভিসের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। মাত্র সাড়ে সাত হাজার মানুষ নিয়ে ১৬ কোটি জনতার দেশে ফায়ার সার্ভিস এতো তৎপরতার সাথে সেবা দিয়ে থাকেন, যে সেটা প্রায় অবিশ্বাস্য। আমি এ প্রজেক্টে তাঁদের সাথে কাজ না করলে তাঁদের অসাধারণত্ব সম্পর্কে আমার অন্য মানুষদের মতোই ভুল ধারনা থেকে যেত।
শুধুমাত্র আগুন নেভানোই ফায়ার সার্ভিসের কাজ নয়। কোথাও কোন দুর্ঘটনা ঘটলে, সেখান থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছানো ফায়ার সার্ভিসের কাজ। শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিও যদি কোথাও আটকা পড়ে, তাদের উদ্ধার করাও ফায়ার সার্ভিসের কাজ। ফলে এই ধরনের সহায়তার জন্য আপনি ৯৯৯ এ ফোন দিতে পারেন।
জরুরী এ্যাম্বুলেন্স সেবা
বাংলাদেশে প্রয়োজনের তুলনায় এ্যাম্বুলেন্স এর সংখ্যা খুবই কম এবং প্রায় কোথাও কোন ফ্রি এ্যাম্বুলেন্স নেই। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ১৫০টি স্টেশনে এ্যাম্বুলেন্স আছে, যেগুলো বিভিন্ন দুর্ঘটনা থেকে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। এই সার্ভিসটি ফ্রি। কয়েকটি সরকারী হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের জন্য ফ্রি এ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। কিন্তু এ সকল সরকারী এ্যাম্বুলেন্স তাদের নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে যেতে চায় না। ফলে ৯৯৯ এর এ্যাম্বুলেন্স সেবাটির অনেকখানিই বেসরকারি এ্যাম্বুলেন্স সেবার উপর নির্ভরশীল।
ফলে ৯৯৯ এর এ্যাম্বুলেন্স এর জন্য সেবা গ্রহণকারীকে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদান করতে হবে।
আমাদের দেশের চলমান এ্যাম্বুলেন্সগুলোর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লাইফ সাপোর্ট সুবিধা, প্যারামেডিক, প্রশিক্ষিত ড্রাইভার নেই। এ্যাম্বুলেন্সগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সর্বোপরি, এই সেবাটি কোন কাঠামোর অধীনেই নেই। তবে আশার কথা হচ্ছে ৯৯৯ এ এ্যাম্বুলেন্স সেবা কিভাবে বাড়ানো যায়, সেটি নিয়ে ৯৯৯ কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আরও উন্নত সেবা পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা রাখি।
অন্যান্য জরুরী সেবা
ধরুন কোথাও কোন বৈদ্যুতিক লাইনে স্পার্কিং হচ্ছে অথবা কোথাও গ্যাস লাইন ফেটে গেছে। যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। বিষয় হচ্ছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ড ঘটছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টি ফায়ার সার্ভিসের কাজের আওতায় পড়ে না। এর জন্য গ্যাস বা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব জরুরী টিম রয়েছে। এই সকল বিষয়ে আপনি ৯৯৯ এ ফোন করলে, কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট দলের কাছে খবর পৌঁছে দেবেন।
ক্রাঙ্ক কলার বা প্রাঙ্ক কলার
টোল ফ্রি নম্বরে প্রতিদিন অনেক মানুষই ফোন করেন। এর মধ্যে একটি বড় সংখ্যক কল করা হয় মজা করার জন্য। এগুলোকে আমরা ক্রাঙ্ক কলার বা প্রাঙ্ক কলার বলে থাকি।
হয়তো কেউ মজা করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা খবর দিলেন যে, অমুক স্থানে আগুন ধরেছে। বিষয়টি হচ্ছে, একটি অগ্নিকান্ডের ঘটনা শোনার ৩ সেকেন্ডের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি স্টেশন ছেড়ে যায়। ফলে তাৎক্ষণিক ভাবে এই ধরনের খবরের সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের উপায় থাকে না। কিন্তু এই ধরনের কলের বিপদ হচ্ছে, জরুরী লাইন ও লজিস্টিক ব্যস্ত থাকে। ফলে ঠিক মুহূর্তে হয়তো সত্যিকার অর্থে যার জীবন সংশয়, তিনি হয়তো সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই বিষয়ে আমাদের সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। অনেক পুরুষ কলার ফোনের এ প্রান্তে, নারীকণ্ঠ পেলেই, বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন। নারী কলাররাও কম যান না। পাইলট ফেজে আমি অনেক পুরুষ এজেন্টকে লজ্জায় চোখ মুখ লাল করে বসে থাকতে দেখেছি। এরা ঠিক কারা ? এই ধরনের কলারদের নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা হওয়া জরুরী বলে মনে করি।
৯৯৯ ও আমাদের শিশুরা
৯৯৯ এর অসচেতন ব্যবহারের একটা উদাহরণ দিই।
পাইলট ফেজে, প্রতিদিন দুপুরে একটি বাচ্চা ফোন দিত। সে ফোন দিয়ে নানা গল্প, কবিতা, ছড়া ইত্যাদি শোনায়। আমরা বাচ্চাটির গার্ডিয়ানের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু কেউ ফোন ধরে না। অবশেষে একদিন সম্ভব হল। ফোনের ওপার থেকে এক ভদ্রমহিলা জানালেন, তার বাচ্চা ফোনে কথা না বললে খেতে চায় না। এটা যেহেতু টোল ফ্রি নম্বর। তিনি ফোনে কানেক্ট করিয়ে দিয়ে বাচ্চাকে ভাত খাওয়ান।
অনেক বাবাকে দেখেছি, ৯৯৯ এ ফোন করে, হ্যালো বলেই বাচ্চার হাতে দিয়ে দিলেন। এরপর বাচ্চা খেলার জন্য এ্যাম্বুলেন্স চাইছে, ফায়ার ব্রিগেড চাইছে।
আবার শিশুরা তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে অন্যান্য শিশুদের সাথে গোল হয়ে বসেও ৯৯৯ এ ফোন দিয়ে থাকে।
অথচ আমাদের বাচ্চারাই সবচেয়ে ভার্নারেবল। আমাদেরকে আমাদের শিশুদেরকে শেখাতে হবে, কিভাবে, কখন ও কেন ৯৯৯ এ তারা ফোন করবে।
গত বছরে আমরা যেসকল বাচ্চাদের ফোন রিসিভ করেছি, তার মধ্যে দুটি ঘটনা ছিল, সত্যিকার অগ্নিকান্ডের। ঐ বাচ্চা দ্বয়ের জন্য বড় দুর্ঘটনা থেকে পরিবার দুটি রক্ষা পেয়েছে।
মোবাইল অপারেটরদের ফোন
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এদেশের মোবাইল অপারেটরা তাদের সাবস্ক্রাইবারদেরকে তাদের নিজস্ব হেল্পডেস্কের নম্বর জানাতে অনেকাংশে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ প্রতিদিনই ৯৯৯ এ হাজার হাজার ফোন আসে (এই সংক্রান্ত ফোনই সর্বাধিক) যেখানে গ্রামীণ, রবি, বাংলালিংক, টেলিটক বা এয়ারটেল এর গ্রাহকরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়ে ফোন করেন।
মোবাইল অপারেটরদেরই তাদের গ্রাহকদের দায়িত্ব নেবার অনুরোধ জানাই। তাঁরা সেটা কিভাবে করবেন, ভেবে দেখার সময় এসেছে।
কৌতূহলী ফোন
অনেক ফোন আসে কৌতূহলে। বাংলাদেশে সত্যিই এমন একটি সেবা আছে ? ফোন যায় ? ফোন দিলে কাজ হবে ? মানুষ টেস্ট করে। অন্যকে টেস্ট করতে অনুরোধ করে। এই সকল কলেও ৯৯৯ ব্যস্ত থাকে। এই ধরনের কৌতূহলী কলও করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে জাতীয় জরুরী সেবা বাস্তবায়নে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলার জন্য গবেষণা করা হয়েছে। রোডম্যাপ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে এগুলো বাস্তবায়িত হবে বলেই বিশ্বাস করি। তবে আমাদের জনগণকে এই সেবার ব্যবহার সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, আমি যখন ৯৯৯ এ ফোন করে আমার কৌতূহল মেটাচ্ছি, ঠিক ঐ মুহূর্তেই হয়তো কেউ তার জীবন দিয়ে আমার কৌতুহলের দায় মেটাচ্ছেন।
বাংলাদেশে এই সেবা নতুন। ফলে এই সেবা ও এর ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের নিজেদের যেমন জানা জরুরী, তেমনি অন্যদেরও জানতে সাহায্য করাটা জরুরী কাজ। সর্বোপরি এমন একটি নতুন সেবা, যেটি নিজের ও অপরের ভুল শুদ্ধ বুঝতে বুঝতে এগুচ্ছে, তার প্রতি আমাদের যথেষ্ট সংবেদশীলতা দেখানো উচিত বলে মনে করি।
ভালো থাকুন। সুস্থ ও নিরাপদ থাকুন।

সুত্রঃ অনলাইন

2 weeks ago

Like - Dislike Votes 0 - Rating 0 of 10

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


আরও দেখুন

ফোরাম বিভাগ